সেনাবাহিনীতে ধর্মভীরুতা...

 সেনাবাহিনীতে ধর্মভীরুতা


একটা কথা দুর্মুখেরা প্রায়ই বলে থাকেন যে সামরিক বাহিনী দিন দিন ধর্মীয় বলয়ে ঢুকছে। কেউ মৌলবাদের গন্ধ ও খোঁজার চেষ্টা করেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে সেনাসদস্যরা বেশির ভাগ মুসলিম পরিবার থেকেই আসে। তাদের স্বাভাবিক ধর্মকর্মের চর্চা স্বাভাবিক। তারপরও ইলেকট্রনিক যুগে যেকোনো তথ্যের কাছে দ্রুত পৌঁছা উৎসাহব্যঞ্জক। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদান-প্রদান তথ্যপ্রবাহকে করেছে আরো গতিময়। সেনাবাহিনীতে দীর্ঘকাল থেকে উপলব্ধি করেছি সেনাসদস্যরা আগের চেয়ে বর্তমানে ধর্মচর্চার ব্যাপারে আরো আগ্রহী হওয়ার কারণ কী?


সামরিক বাহিনীতে যোগদানকারী একজন তরুণ প্রথমে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও দেশসেবার আদর্শ নিয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে যখন সে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে শপথগ্রহণ করে, তখন তার জীবনের দর্শনই বদলে যায়। সে উপলব্ধি করে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকারী নয়, বরং বিনয়ী করে। আর বিনয় থেকেই জন্ম নেয় সৃষ্টিকর্তার প্রতি নির্ভরতা।




আমার কর্মজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে মাঠপর্যায়ে, দুর্গম এলাকায় এবং অপারেশনাল পরিবেশে। বিশেষ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকারী একজন সেনাসদস্য প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান। কখন, কোথায়, কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক প্রিয় সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, অনেককে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করতে এবং অসংখ্য পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা বহন করতে দেখেছি। এমন বাস্তবতার মধ্যে একজন সৈনিকের সৃষ্টিকর্তার স্মরণে শান্তি খোঁজা খুবই স্বাভাবিক।


অনেকে মনে করেন, সেনাসদস্যদের ধর্মচর্চা বুঝি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাপের ফল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পূর্ণ ভিন্ন। দুর্গম পাহাড়ের নির্জন ক্যাম্পে দিনের অপারেশন শেষে বিনোদনের সুযোগ খুবই সীমিত। সে সময় অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েন, নামাজ আদায় করেন বা নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করেন। এটি আদেশের কারণে নয়; বরং মানসিক প্রশান্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আত্মিক শক্তি অর্জনের একটি ব্যক্তিগত উপায়।


জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং দায়িত্বপূর্ণ পরিবেশ একজন সৈনিককে আরো আত্মনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। সেখানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন সেনাসদস্যদের শৃঙ্খলাবোধকে আরো দৃঢ় করে। GeographicReference


একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী কোনো একটি ধর্মের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সংবিধানের প্রতি অনুগত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন ধর্মের সদস্য একসঙ্গে কাজ করেন, একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন, একসঙ্গে দেশের জন্য জীবন বাজি রাখেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার ভোগ করেন এবং সহকর্মীর ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল থাকেন। এই পারস্পরিক সম্মানই বাহিনীর শক্তির অন্যতম ভিত্তি।


সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাপ্রধানের দাড়ি রাখা বা কোনো সেনাসদস্যের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিদ্রুপ করতে দেখা যায়। ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনকে রাজনৈতিক বা বিদ্বেষমূলক বিতর্কে টেনে আনা সমীচীন নয়। একজন সৈনিকের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার সততা, পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে—তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের ভিত্তিতে নয়।


আমার বিশ্বাস, মৃত্যুর ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ জীবনের প্রকৃত মূল্য সবচেয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করে। একজন সৈনিক যখন সীমান্তে, পাহাড়ে বা শান্তিরক্ষা মিশনে দেশের পতাকা বুকে ধারণ করে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার কাছে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস—এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অন্যের পরিপূরক।


এ কারণেই আমার কাছে সেনাসদস্যদের ধর্মীয় অনুশীলন কোনো বিস্ময়ের বিষয় নয়। এটি তাদের পেশাগত বাস্তবতা, আত্মিক শক্তি, নৈতিক চেতনা এবং দায়িত্ববোধের স্বাভাবিক প্রকাশ।



🎁 Your Special Offer is Loading...

Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.

15s

⏳ Stay here — your offer will open shortly.
✅ You can go back to this page anytime.

Comments

Popular posts from this blog

আর দেখা যাবে না গোলাম মাওলা রনিকে...see more

এটাই কি তাহলে আসল ঘটনা...Seemore

অবশেষে বেরিয়ে আসলো সত্য ঘটনা, সোহেল বলে আমি একা করি নাই আমার সা….see more